বাংলা বর্ষপঞ্জিতে জ্যৈষ্ঠ মাসকে “মধুমাস” বলা হয়। এই সময় প্রকৃতি ভরে ওঠে নানা রকম রসালো ও সুস্বাদু ফলে—আম, কাঁঠাল, লিচু, জামসহ নানা ফলের প্রাচুর্যে চারদিক যেন মধুময় হয়ে ওঠে। ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলেও, এই মধুমাস আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত ও রহমতের প্রতীক। কারণ আল্লাহ তাআলা মানবজাতির কল্যাণে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফলমূল ও খাদ্যের ব্যবস্থা করে দেন, যাতে মানুষ তা ভোগ করতে পারে এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়।
এই সময় আমরা যে ফলগুলো খাই, সেগুলোর বীজ নষ্ট না করে সংরক্ষণ করা এবং তা দিয়ে নতুন গাছ রোপণ করা ইসলামের একটি শিক্ষা। ইসলামে বৃক্ষরোপণ একটি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
আনাস রা.থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যদি কোনো মুসলিম কোনো গাছ রোপণ করে অথবা ক্ষেতে ফসল বোনে। আর তা থেকে কোনো পোকামাকড় কিংবা মানুষ বা চতুষ্পদ প্রাণী খায়, তাহলে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ২৩২০; মুসলিম, হাদিস : ৪০৫৫)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো বৃক্ষরোপণ করে আর ফলদার হওয়া নাগাদ তার দেখাশোনা ও সংরক্ষণে ধৈর্য ধারণ করে, তার প্রতিটি ফলের বিনিময়ে আল্লাহ তাকে সদকার সওয়াব দেবেন।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৬৭০২; শুআবুল ইমান, হাদিস : ৩২২৩)
এই হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি, গাছ লাগানো শুধু পরিবেশ রক্ষার কাজ নয়, বরং এটি একটি ইবাদতও বটে। মধুমাসে আমরা যখন বিভিন্ন ফল খাই, তখন সেসব ফলের বীজ সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন জায়গায় রোপণ করতে পারি—যেমন বাড়ির আশেপাশে, রাস্তার ধারে, খালি জমিতে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে। এতে করে ভবিষ্যতে নতুন গাছ জন্মাবে এবং মানুষ ও প্রাণীকুল তার থেকে উপকৃত হবে। এই কাজটি একটি চলমান সদকা বা সদকায়ে জারিয়া হিসেবে আমাদের আমলনামায় যুক্ত হবে। এছাড়া ইসলাম আমাদেরকে অপচয় থেকে বিরত থাকতে শিক্ষা দেয়। ফল খাওয়ার পর বীজ ফেলে না দিয়ে তা কাজে লাগানো অপচয় রোধের একটি উত্তম উদাহরণ। একই সঙ্গে এটি পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের যে সংকট দেখা দিয়েছে, তা মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণ অত্যন্ত জরুরি—আর ইসলামও এই কল্যাণকর কাজকে উৎসাহিত করে। মধুমাসে বীজ বপনের পাশাপাশি আমরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিভিন্ন গাছ রোপন করতে পারি। উৎসাহিত করতে পারি পরিবার পরিজন ও বন্ধু বান্ধবদের। স্থানীয় ইমাম-খতিব সাহেবদেরও এ বিষয়ে আলোচনা ও পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে পারি। পাড়ায় পাড়ায় বীজ সংগ্রহ ও তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আলাদা আলাদা টিম ভিত্তিক কাজ করতে পারি। আপাতদৃষ্টিতে কাজটা অনেক ছোট মনে হতে পারে,কিন্তু এর সওয়াব দুনিয়াতে পাওয়ার পাশাপাশি আখিরাতেও আমরা পাবো ইনশাআল্লাহ। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে— মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করা। আর সেটা যে কোনো নেক আমলের মাধ্যমেই হোক না কেন।
জ্যৈষ্ঠ মাসের মধুময় ফল শুধু আমাদের জিহ্বার তৃপ্তিই দেয় না, বরং আমাদের জন্য সওয়াব অর্জনের একটি বড় সুযোগও এনে দেয়। আমরা যদি ফলের বীজ সংগ্রহ করে তা রোপণ করি এবং বৃক্ষরোপণে অংশগ্রহণ করি, তাহলে তা হবে একদিকে পরিবেশ রক্ষার কাজ, অন্যদিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি সুন্দর মাধ্যম। তাই আসুন, মধুমাসে ফল ভোগের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করি এবং আখিরাতের জন্য পুণ্য সঞ্চয় করি।
