১৮ জুন,২০২১ সাল। ঘড়ির কাটায় তখন রাত আটটার কিছুটা এপার অথবা ওপার। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিও পড়ছে। সেদিন আকাশ যেন অন্যান্য দিনের চেয়ে মুখটা বেশি ভার করে ছিল।
বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার তুলাছড়ি পাড়ার ঘরগুলোতে অন্যান্য দিন সোলারের আলো জ্বললেও অদৃশ্য এক কারনে সেদিন সব লাইট বন্ধ ছিল। হয়তো অনেকে পূর্বেই আন্দাজ করতে পেরেছিল— ভয়ংকর কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। বাইরে থেকে থেকে দমকা হাওয়া বইছিল। সঙ্গে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। হঠাৎ বাইরে থেকে ডাক আসে— পূর্ণেন্দু। এই পূর্ণেন্দু ত্রিপুরা। তিনি তখন ঘরের ভিতরই ছিলেন। জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বাইরে দেখলেন। ততক্ষণে সন্ত্রাসী বাহিনী ঘরের দরজা ভেঙে ফেলেছে। তাকে ঘরের বাইরে এনে হুমকি দিচ্ছিলো— আবার পূর্বের ধর্মে ফিরে যেতে। কিন্তু যে একবার ঈমানের সাধ পায়,তাকে রুখে সাধ্য কার। তিনি দ্ব্যর্থ কণ্ঠে সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। মুহুর্তের তাকে মাথার পেছনে ও পিঠে গুলি করে কাপুরুষেরা। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পান করেন শাহাদাতের অমীয় সুধা। সারারাত তার লাশটি সেখানে পড়ে ছিল। সেদিন ভোরে তার মসজিদে আর ফজরের আজান হলো না। পাহাড়ে ধ্বনিত হলো না —আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার।
এতক্ষণ যার কথা বলা হলো— তিনি আমাদের এক নওমুসলিম ভাই। নাম শহিদ ওমর ফারুক ত্রিপুরা রহ.। পূর্বনাম পুর্নেন্দু ত্রিপুরা। তার বাবা বৌদ্ধ ধর্ম থেকে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। ২০১৪ সালে পুর্নেন্দু ত্রিপুরা থানচিতে তার একজন উপজাতীয় মুসলিম বন্ধুর দাওয়াতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। এরপর বান্দরবানে এসে ইসলাম ধর্ম এবং ওমর ফারুক নাম গ্রহণ করেন। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তিনি ঢাকায় গিয়ে তাবলিগে যোগ দেন।তাবলিগে এক চিল্লা(৪০দিন) সময় দেয়ার পর নিজ গ্রামে ফিরে এসে মেয়ে হাফসা ও আমেনাকে ঢাকায় নিয়ে এসে মাদ্রাসাতে ভর্তি করে দেন।
ঢাকা থেকে রোয়াংছড়িতে ফিরে আসার পর শান্তিবাহিনী তার বাড়িতে গিয়ে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করার জন্য প্রাণনাশের হুমকি দেয়। কিন্তু সাহসী ওমর ফারুক রহ. তাদেরকে বলে, ধর্ম পরিবর্তন তার অধিকার। কাজেই কোনো ভুল বা অন্যায় তিনি করেননি। তবুও সন্ত্রাসীরা তাকে হুমকি দিলে তিনি সন্ত্রাসীদের বলেন,
তোমরা কী করবে আমার। প্রাণ নিবে, নাও। আমি বুক পেতে দিলাম। গুলি করো। আমি শহিদ হয়ে যাবো। এই বলে তিনি জামার বোতাম খুলে সন্ত্রাসীদের সামনে বুক চেতিয়ে দাঁড়ান।
সেদিন ওমর ফারুক রহ. এর ত্বাকওয়া ও ঈমানী চেতনার কাছে হতবিহ্বল হয়ে সন্ত্রাসীরা তাকে গুলি না করে ফিরে যায়।
এরপর তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেন দাওয়াতি কাজের জন্য। আবিষ্কার করেন নিজেকে দাঈরূপে। একে একে পাহাড়ের বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায় ছড়িয়ে দিতে থাকেন তাওহীদের বানী— লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তিনি তার আশেপাশের অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াত দিতে শুরু করেন এবং একটির পর একটি পরিবারকে ইসলামের আলোয় দিক্ষিত করতে থাকেন।বেশ কিছু পরিবার ইসলামের সুশীতল ছায়ায় চলে আসলে ওমর ফারুক রহ. একটি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন এবং এ লক্ষ্যে নিজের এক একর জমি মসজিদকে দান করেন। ২০১৮ সালে নিজের জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন একটি মসজিদ। চারপাশে বাঁশ ও বেতের বেড়া। উপরে লতাপাতার ছাউনি। একজন ভালো মানের তিলাওয়াত সম্পন্ন ইমাম খুঁজলেন। কিন্তু কোথাও পাননি। কে যাবে এত দূর্গম পাহাড়ে ইমামতি করতে ? অবশেষে তিনি নিজেই সে মসজিদে ইমামতি শুরু করেন। আর সমান তালে চলছিল তার দাওয়াতি কাজ। তার দাওয়াতি কাজের মেহনতে আল্প সময়ের মাঝে ৩২ টা ত্রিপুরা পরিবার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা কোনোভাবেই তাকে থামাতে পারছিলো না। কি হুমকি ধামকি। কিইবা মরনের ভয়! তাকে মেরে ফেলা হবে— এ বুলি ছিল পাহাড়ের ওপেন সিক্রেট।
কিন্তু পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের তা কোনোভাবেই সহ্য হচ্ছিলো না। তাই নানাভাবে তাকে বলপ্রয়োগ করা হয় দাওয়াতি কাজ বন্ধ করার জন্য। কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা। তার স্পষ্ট জবাব— তিনি তা ছাড়বেন না।
পাহাড়ি সন্ত্রাসিদের গাত্রদাহ চরমে পৌঁছায়, যখন তিনি মসজিদে মাইক ব্যবহার শুরু করেন। মাইকে আজানের আওয়াজ মসজিদ থেকে পাহাড়ে, এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে দৈনিক পাঁচবেলা। এই মাইক লাগানোর পর থেকে তার উপর নতুন করে প্রাণনাশের হুমকি শুরু হয়। তিনি প্রায়ই তার পরিবার, স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিকট বলতেন, ওরা আমাকে হত্যা করবে। বস্তুত ঘটেছেও তাই।
এরপর ২০২১ সালের ১৮ জুনের ঘটনা। সেদিন তিনি এশার নামাজ আদায় করে ঘরেই ছিলেন। পরিবারের বাকি সদস্যরা রাতের খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আচমকা গুলির আওয়াজ শুনে কারোরই আর বুঝতে বাকি রইল না,কি ঘটেছে।
অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা দরোজা ভেঙে ঘরে ঢুকে তার দিকে অস্ত্র তাক করলে ওমর ফারুক রহ. এর স্ত্রী স্বামীকে রক্ষা করতে ছুটে যান। কিন্তু সন্ত্রাসীরা তার বুকে লাথি মারলে তিনি ছিটকে পড়ে যান। এসময় সন্ত্রাসীরা খুব কাছে থেকে ওমর ফারুকের মাথায় দুই রাউন্ড গুলি করলে তিনি মুখ থুবড়ে পড়ে যান এবং সাথে সাথেই শাহাদাত বরণ করেন।
প্রতিবেশি খ্রিস্টান পরিবারগুলো সে রাতে কেউই ঘর থেকে বের হননি। নওমুসলিম পরিবারগুলোর উপরও সন্ত্রাসীদের নানামুখী চাপ ছিল। গুলির শব্দ শোনার পর পরই নওমুসলিম পরিবারগুলো পাহাড়ের এদিক সেদিক ভয়ে পালিয়ে যায় রাতের বেলায়ই। রোয়াংছড়ি উপজেলা সদর থেকে প্রায় আঠারো কিলোমিটার দূরে কে তাদের নিরাপত্তা দিবে? পরবর্তীতে অনেকগুলো নওমুসলিম পরিবার আবার খ্রিস্টধর্মে ফিরে গেছে। আহ!আফসোস।আমরা কিছুই করতে পারলাম না।
ওমর ফারুক ত্রিপুরা রহ. সেদিন শহিদ হয়ে গেলেন। চলে গেলেন মহান রবের দরবারে। কিন্তু আমাদের কাছে রেখে গেলেন মহান এক গুরুদায়িত্ব। তার অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করা।আমরা কি প্রস্তুত সে দায়িত্বভার গ্রহণ করতে?ফারুক মানে সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী। তিনি সত্যের যে মশাল জ্বালিয়ে গিয়েছেন,আমরা কি তার উত্তরাধিকার হবো না? মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিবো না তাওহীদের বাণী? মহান আল্লাহ তায়ালা শহিদ ওমর ফারুক ত্রিপুরা রহ. জান্নাতের পাখি হিসেবে কবুল করুন। আমিন!
