বর্তমান বিশ্বে মুসলিম উম্মাহ এক গভীর সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। গাজার নিরীহ শিশু-নারী-পুরুষের আর্তচিৎকার, তুর্কিস্থানের মুসলমানদের দীর্ঘশ্বাস, বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমানদের ওপর চলমান শোষণ-নিপীড়ন—এই সবকিছুই উম্মাহর সম্মিলিত দুর্দশার চিত্র বহন করে। পাশাপাশি ফিতনা, বিভ্রান্তি ও ভ্রান্ত মতাদর্শের ঝড় উম্মাহর ভেতর আধ্যাত্মিক শূন্যতা সৃষ্টি করছে। পৃথিবীর এমন কোনো প্রান্ত নেই যেখানে মুসলমানরা নিরাপত্তাহীনতার শিকার নয়।
এই দূরবস্থার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসৃত আদর্শিক জীবনব্যবস্থা থেকে দূরে সরে যাওয়া এবং তার পরিবর্তে অমুসলিম জাতিসমূহের নীতি-আদর্শকে জীবনে প্রাধান্য দেওয়া। অথচ সাহাবায়ে কেরাম রা. জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে—যুদ্ধ, দারিদ্র্য, অভাব-অনটন—সব অবস্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করতেন। তাই সংকটে নিমজ্জিত উম্মাহর মুক্তি নিহিত রয়েছে একমাত্র—নবীজির সুন্নাহ ও আদর্শিক পথের দিকে ফিরে আসার মধ্যেই।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমি তোমাদের নিকট দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা এ দুটো আঁকড়ে ধরবে, কখনো পথভ্রষ্ট হবে না—এগুলো হলো আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবীর সুন্নাহ।”
— মুয়াত্তা মালিক : ৩৩৩৮
ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে—যা যুগ পেরিয়ে পরম্পরাগতভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তেমনই এক আলোকোজ্জ্বল ঘটনা হলো হিলফুল ফুযুল, যা নবুওয়াতের পূর্বে সংঘটিত হলেও বর্তমান সমাজব্যবস্থা ও মুসলিম জীবনের জন্য গভীর শিক্ষার উৎস।
হিলফুল ফুযুল : ইতিহাস ও পটভূমি
মক্কার বণিক সমাজে এক ইয়ামেনি ব্যবসায়ী প্রভাবশালী এক কুরাইশ নেতার কাছে পণ্য বিক্রি করেও ন্যায্য মূল্য পাননি। তিনি মক্কার বিভিন্ন নেতার কাছে ন্যায়বিচারের আবেদন জানালে কিছু ন্যায়পরায়ণ যুবক তার পাশে দাঁড়ান। তারা অন্যায় প্রতিহত করতে এবং মজলুমের হক আদায় করতে উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
এই উদ্যোগে আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের বাড়িতে কুরাইশের বিভিন্ন গোত্র—হাশিম, তায়িম, জুহরা—একের পর এক নেতারা একত্রিত হয়ে একটি মহান মানবিক অঙ্গীকারে শামিল হন। ইতিহাসে এই অঙ্গীকারই হিলফুল ফুযুল নামে পরিচিত।
অঙ্গীকারের সারকথা ছিল—সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, মজলুমের পাশে দাঁড়ানো, জুলুমকারীদের প্রতিহত করা।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তরুণ বয়সে এই অঙ্গীকারে অংশগ্রহণ করেন। নবুওয়াতের পরে তিনি এই অঙ্গীকারের প্রশংসা করে বলেন— “আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের ঘরে যে চুক্তিতে আমি অংশগ্রহণ করেছিলাম, লাল উটের বিনিময়েও আমি তা ত্যাগ করতাম না। ইসলাম যুগেও যদি এমন চুক্তির আহ্বান আসতো, আমি তাতে সাড়া দিতাম।”
— বাইহাকি (২/১৩৪৬১), সীরাত ইবনে হিশাম (১ম খণ্ড)
এর মাধ্যমে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবিক দায়িত্ব, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সম্মিলিত প্রতিরোধের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
বর্তমান সময়ের জন্য হিলফুল ফুযুলের শিক্ষা
১. সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান :
বর্তমান সমাজে মানুষের আর্থিক সমৃদ্ধি ঘটলেও আত্মিকভাবে অধিকাংশ মানুষ দেউলিয়া। ফলে এরা অন্যায়, অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, জুলুম, সুদ, ঘুষ থেকে নিজেকে বিরত থাকতে পারে না।
এতে সমাজের দূর্বল শ্রেণি শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়। যেমন -২৮ জুলাই, ২০২৪ সালে ঢাকা মেইলের এক
সংবাদে বলা হয় নীলফামারির ডিমলায় দাদন ব্যাবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে ঘরছাড়া শত পরিবার তাদের অপরাধ সময়মতো
সুদ পরিশোধ করতে না পারা। অথচ আমাদের দেশের প্রায় সকল মিম্বার থেকেই সুদের বিরুদ্ধে আলোচনা করা হয়। এতে সাধারণ মানুষ সুদ গ্রহণ কিংবা দানে নিরুৎসাহিত হলেও বিকল্প না থাকার কারণে আবার সেই সুদেরই দ্বারস্থ হয়। এক্ষেত্রে সত্যের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের জন্য প্রতিটি সমাজে মৌলিক প্রতিবাদ, প্রতিরোধের পাশাপাশি মসজিদ ভিত্তিক কর্জে হাসানার ফান্ড গঠন করা যেতে পারে।
সুদের বিপরীতে সত্য ও হালালের পক্ষে এটি হবে একটি বড় পদক্ষেপ।
২. সামাজিক শক্তি অর্জন ও মানবতার পাশে দাঁড়ানো।
ইসলাম কেবলমাত্র মৌলিক কিছু ইবাদত যেমন যেমন- নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাতের, মধ্যে সীমাকবদ্ধ নয়। সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব পালন করাও ইসলামের অপরিহার্য অংশ স্বতন্ত্র ইবাদত। সামাজিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে আমরা উদাসীন। সমাজ নিয়ে আমাদের কোনো চিন্তায় নেই যেন। তাই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমরা অসহায়দের সহায় হচ্ছি না। বিপদে আপদে তার পাঁশে দাড়াচ্ছি না। ফলে এ সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে খ্রিস্টান মিশনারীসহ বিভিন্ন এনজিও। তারা শিক্ষা, সেবা, চিকিৎসার নামে মানুষের মন জয় করে ঈমানটুকু হরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। এ সকল বিষয়ে আমরা সর্তক হই। নিজ সাধ্যানুযায়ী সামাজিক ও মানবিকভাবে সচেষ্ট হই।
* যুব সমাজের পুর্ণজাগরণ
যুবকরা সমাজের প্রাণ। এরাই জাতির আগামী দিনের কান্ডারি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে যুবক বয়সে সামাজিক কাজে যুক্ত ছিলেন যুবকদেরও উচিত সেভাবে সামাজিক কাজের মাধ্যমে নিজেদেরকে জাগ্রত রাখা। পরিশেষে শুধু এতটুকুই বলবো- হিলফুল ফুজুল কেবলমাত্র একটি ইতিহাস নয়, বরং একটি চেতনা-ন্যায়, মানবতা ও ঐক্যের প্রতীক। আমাদের সমাজে যেভাবে আজ জুলুম অত্যাচার ও বৈষম্য বেড়ে গেছে, তাতে হিলফুল ফুজুলই হতে পারে আমাদের করণীয় দিশা।
আসুন, অতীতের এই আলাককর্তকা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা ন্যায়, ইনসাফ, ও মানবিক সমাজ গড়ার পথে এগিয়ে যাই।
